ব্রিটেনের স্থানীয় নির্বাচন: ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ
আজ বৃহস্পতিবার (৭ মে) ব্রিটেনজুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইংল্যান্ডের বিভিন্ন কাউন্সিল ও মেয়র পদে নেতৃত্ব নির্ধারণের এই ভোট ব্রিটিশ রাজনীতির জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, নেতৃত্বের সংকট এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনের বাঙালিপাড়াগুলোতে এবারের নির্বাচন কেবল দলীয় লড়াই নয়, বরং ব্যক্তি প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক অনাস্থা ও বড় দলগুলোর সংকট দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে মূলধারার বড় দলগুলোর প্রতি ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে বর্তমান ব্রিটিশ বাংলাদেশি চারজন এমপির মধ্যে অন্তত দুজনের জন্য পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ক্ষোভ থেকে অনেক ভোটার এখন বিকল্প শক্তি হিসেবে গ্রিন পার্টির মতো দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
টাওয়ার হ্যামলেটসের সমীকরণ ও অভ্যন্তরীণ লড়াই পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশিদের প্রধান সমর্থন লেবার পার্টির দিকে থাকলেও মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এখানে স্থানীয় সম্পর্ক এবং ‘শত্রুর শত্রু’ সমীকরণ অনুযায়ী ভোট বিভাজিত হয়ে পড়ে। টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবারের নির্বাচনেও স্পষ্ট। প্রবীণ নেতাদের মধ্যকার মতপার্থক্য এবং মনোনয়ন কেন্দ্রিক বিরোধের জেরে দলের ভেতরেই একাধিক বলয় তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
লেবার পার্টির মেয়র প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিনের কাউন্সিলর হলেও সাবেক মেয়র লুৎফুর রহমানের প্রচারণা কৌশলের সামনে তিনি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। লুৎফুর রহমানের পক্ষে স্থানীয় মসজিদ ও ইসলামি সংগঠনগুলোর একটি বড় অংশের সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে।
অর্জনের নতুন মাইলফলক তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও এবারের নির্বাচনে একটি বড় ইতিবাচক দিক হলো—শীর্ষ সাত মেয়র প্রার্থীর মধ্যে চারজনই ব্রিটিশ বাংলাদেশি। লেবার ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে আসা এই চার প্রার্থীর অংশগ্রহণকে ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যান্য দলের ভূমিকা ও প্রচার কৌশল এবারের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের বাইরেও ভিন্নধর্মী প্রচারণা লক্ষ্য করা গেছে। সাধারণত লেবার এমপির পাশে থাকা অনেক নেতাকেও এবার স্বতন্ত্র বা অন্যান্য প্রার্থীর পক্ষে মাঠে দেখা গেছে। অন্যদিকে, লুৎফুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অত্যন্ত একাগ্র ও কৌশলী। এর বিপরীতে প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের প্রচারণায় দৃশ্যমান কোনো নতুন কৌশলের অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও নেতৃত্ব সংকট নির্বাচনে শুধু লুৎফুর রহমানই নন, নিউহ্যাম থেকে লেবার পার্টির মনোনীত বাংলাদেশি প্রার্থী ফরহাদ হোসেনেরও মেয়র হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ব্রিটেনজুড়ে প্রায় সাড়ে তিনশ বাংলাদেশি কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা গত নির্বাচনের তুলনায় বেশি।
তবে বড় এই অংশগ্রহণের পরও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, বর্তমান নেতৃত্ব নিজেদের পাশাপাশি শক্তিশালী কোনো উত্তরসূরি বা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। এছাড়া ভারত বা পাকিস্তান বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের তুলনায় বাংলাদেশিরা কমিউনিটিগত ঐক্যের অভাবে পিছিয়ে রয়েছেন বলে মনে করা হয়।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে সাদিক খান বা ঋষি সুনাকের মতো বড় উচ্চতায় কোনো বাংলাদেশির পৌঁছানোর স্বপ্ন থাকলেও, সেই পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে নিজেদের মধ্যকার কোন্দল এবং অসহযোগিতার সংস্কৃতিকে। আজ রাতের ভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে, ব্রিটিশ বাংলাদেশিরা কি নতুন কোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে হাঁটবেন, নাকি পুরোনো সংকটে আবারও আটকা পড়বেন।
