যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের অভাবনীয় সাফল্য: GCSE থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অগ্রগতির চিত্র

ব্রিটিশ বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাগত সাফল্য: GCSE থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত উন্নতির উজ্জ্বল চিত্র এবং স্কলারশিপের নতুন দুয়ার

Group of British Bangladeshi students walking on a UK university campus


লন্ডন, ১৮ এপ্রিল ২০২৬: যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষাক্ষেত্রে অসাধারণ অগ্রগতি দেখাচ্ছেন। একসময় যেখানে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের অ্যাটেনমেন্ট গড়ের নিচে ছিল, সেখানে এখন তারা অনেক ক্ষেত্রে হোয়াইট ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের চেয়ে এগিয়ে গেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউট (EPI) এবং অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের GCSE ও A-লেভেলে উন্নতি লক্ষণীয়। এছাড়া উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের হারও বেড়েছে, যা প্রবাসী সম্প্রদায়ের জন্য আশার আলো জ্বালিয়েছে।


GCSE-তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি

২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ইংল্যান্ডে ফ্রি স্কুল মিল (FSM)-এলিজিবল বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫০.৪% ইংরেজি ও গণিতে গ্রেড ৫ বা তার উপরে অর্জন করেছেন। এই হার হোয়াইট ব্রিটিশ FSM শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক বেশি (১৯%)। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের অ্যাটেনমেন্ট ৮ স্কোর ৫০-৫২ পয়েন্টের আশেপাশে, যা এশিয়ান গ্রুপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।  

এডুকেশন পলিসি ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা হোয়াইট ব্রিটিশদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছেন—প্রায় ১.৯ মাসের গ্যাপ কমেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিক্ষার্থীরা এই অগ্রগতিতে এগিয়ে। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের মতো বাংলাদেশী-অধ্যুষিত এলাকায়ও ২০২৫ সালের কী স্টেজ ২ ফলাফলে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ৭১% এক্সপেক্টেড স্ট্যান্ডার্ড অর্জন করেছেন, যা স্থানীয় গড়ের চেয়ে ভালো।


A-লেভেল ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ

A-লেভেলে এশিয়ান/এশিয়ান ব্রিটিশ গ্রুপের (বাংলাদেশীসহ) অগ্রগতি ধারাবাহিক। ২০২৪-২৫ সালে সামগ্রিক A-লেভেল অ্যাভারেজ পয়েন্ট স্কোর বেড়েছে এবং বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা এতে পিছিয়ে নেই। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ২০২৩-২৪ সালে এশিয়ান/এশিয়ান ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের হার ৬৭.৪%, যা সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা FSM-এলিজিবল হলেও উচ্চ হারে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন।

অনেক ব্রিটিশ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী অক্সব্রিজ ও রাসেল গ্রুপ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান করে নিচ্ছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্লিককেমব্রিজ’ প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন আউটরিচ উদ্যোগ বাংলাদেশী, পাকিস্তানি ও আরব বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করছে।


স্কলারশিপ ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ

ব্রিটিশ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা ইউকে-ডমিসাইল্ড (হোম) স্টুডেন্ট হিসেবে স্টুডেন্ট ফাইন্যান্স ইংল্যান্ডের আওতায় টিউশন ফি লোন ও মেইনটেন্যান্স লোন পান। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মেরিট-ভিত্তিক ও নিড-ভিত্তিক স্কলারশিপ প্রদান করে। উদাহরণস্বরূপ:  

- উইডনিং পার্টিসিপেশন স্কলারশিপ:

অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বা এথনিক মাইনরিটি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বার্সারি।  

- ইউনিভার্সিটি-স্পেসিফিক অ্যাওয়ার্ডস:

ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম, লন্ডনের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশী হেরিটেজ শিক্ষার্থীদের জন্য টার্গেটেড ফান্ডিং রয়েছে।  

- প্রেস্টিজিয়াস প্রোগ্রাম:

কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ডের আউটরিচ স্কিম এবং কমনওয়েলথ স্কলারশিপের মতো প্রোগ্রামে (যদিও মূলত ইন্টারন্যাশনালদের জন্য) দ্বৈত নাগরিকত্বধারী বা বিশেষ ক্ষেত্রে সুযোগ মেলে।  

GREAT স্কলারশিপসহ বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি অ্যাওয়ার্ড বাংলাদেশী হেরিটেজ শিক্ষার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত। এছাড়া কমিউনিটি-ভিত্তিক ফাউন্ডেশন (যেমন ব্রিটিশ বাংলাদেশী ট্রাস্ট) থেকে ছোট-বড় গ্রান্ট পাওয়া যায়।


কেন এই সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ? 

এই অগ্রগতি শুধু ব্যক্তিগত নয়, পুরো ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য মাইলফলক। টাওয়ার হ্যামলেটস, বার্মিংহাম ও ম্যানচেস্টারের মতো এলাকায় বাংলাদেশী পরিবারগুলো শিক্ষাকে সামাজিক গতিশীলতার চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন। শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরিবারের শিক্ষাগত আকাঙ্ক্ষা, শিক্ষকদের সমর্থন এবং কমিউনিটি নেটওয়ার্ক এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।


তবে চ্যালেঞ্জও আছে। আর্থিক চাপ, ওভারক্রাউডেড হাউজিং এবং ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংয়ের অভাব এখনও কিছু শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে। তাই সরকারি ও কমিউনিটি উদ্যোগ আরও জোরদার করা দরকার।

ব্রিটিশ বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের এই শিক্ষাগত সাফল্য প্রমাণ করে যে, দৃঢ় সংকল্প ও সঠিক সুযোগের সমন্বয়ে যেকোনো বাধা অতিক্রম করা সম্ভব। যারা এখন GCSE বা A-লেভেলে পড়ছেন, তাদের জন্য এটি অনুপ্রেরণা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও কমিউনিটি লিডারদের প্রতি আহ্বান—এই গতি ধরে রাখতে আরও বেশি স্কলারশিপ ও মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করুন।  

প্রবাসী বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এই উজ্জ্বল যাত্রা শুধু যুক্তরাজ্য নয়, বাংলাদেশেরও গৌরব। এক্সপ্রেস টিভি ও অন্যান্য মাধ্যমে এমন সফলতার গল্প আরও বেশি করে তুলে ধরা উচিত।  


তথ্যসূত্র: 

- Department for Education & Ethnicity Facts and Figures (২০২৪-২৫)
- Education Policy Institute Annual Report ২০২৫
- GOV.UK Widening Participation in Higher Education ২০২৩-২৪
- Tower Hamlets Council Provisional Attainment Data ২০২৫