দেশজুড়ে 'কৃষক কার্ড' চালু করছে সরকার—কারা পাবেন, কী সুবিধা থাকছে?

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই মাসের মাথায় সারা দেশে 'কৃষক কার্ড' চালু করতে যাচ্ছে বর্তমান বিএনপি সরকার। আগামীকাল মঙ্গলবার (পহেলা বৈশাখ) টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই যুগান্তকারী কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা কৃষি উপকরণ কেনা থেকে শুরু করে ফসল বিক্রি এবং আর্থিক সহায়তাসহ বহুমুখী সুবিধা পাবেন।



কীভাবে এই কার্ড কাজ করবে এবং কারা এর সুবিধা পাবেন, তার বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো:

কারা পাবেন এই কৃষক কার্ড?

কৃষি মন্ত্রণালয় দেশের ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক পরিবারকে জমির পরিমাণের ভিত্তিতে ৫টি শ্রেণিতে ভাগ করেছে:

  • ভূমিহীন কৃষক: যাদের জমির পরিমাণ ৫ শতকের কম।
  • প্রান্তিক কৃষক: যারা ৫ থেকে ৪৯ শতক জমির মালিক।
  • ক্ষুদ্র কৃষক: যাদের জমির পরিমাণ ৫০ থেকে ২৪৯ শতক।
  • মাঝারি কৃষক: যারা ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক জমির মালিক।
  • বড় কৃষক: যাদের ৭৫০ শতকের বেশি জমি রয়েছে।

বিশেষ অন্তর্ভুক্তি: এই কার্ড কেবল ফসল উৎপাদনকারীদের (ভূমিচাষী) জন্যই নয়; বরং মৎস্যজীবী, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামারি, দুগ্ধ খামারি এবং লবণ চাষিরাও এই কার্ডের আওতাভুক্ত হবেন।


কৃষক কার্ডের আকর্ষণীয় সুবিধাসমূহ

এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা যেসব বিশেষ সুবিধা উপভোগ করবেন:

  • ন্যায্যমূল্যে উপকরণ: বীজ, সার, কীটনাশকসহ সব ধরনের কৃষি উপকরণ এবং সেচ সুবিধা ন্যায্যমূল্যে পাওয়া যাবে।
  • সহজ লেনদেন: সরকার নির্ধারিত ডিলারদের কাছে ডিজিটাল 'পয়েন্ট অব সেল' (পিওএস) মেশিন থাকবে, যার মাধ্যমে কৃষকরা সহজেই কার্ড পাঞ্চ করে কেনাকাটা করতে পারবেন।
  • আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা: সহজ শর্তে কৃষিঋণ, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি এবং কৃষি বিমার সুবিধা মিলবে।
  • তথ্যসেবা: মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বাজারের তথ্য এবং ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ পাওয়া যাবে।
  • ফসল বিক্রি ও প্রণোদনা: সরকারের কাছে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে ফসল বিক্রির পাশাপাশি সরকারি যেকোনো প্রণোদনা বা ভর্তুকি সহজেই পাওয়া যাবে।

নগদ অর্থ সহায়তা

সব কার্ডধারী নগদ অর্থ পাবেন না। মূলত দরিদ্র কৃষকদের সহায়তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে:

  • শুধুমাত্র ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের বছরে ২,৫০০ টাকা করে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
  • সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে সরাসরি এই টাকা পৌঁছে যাবে। ফলে এই কৃষক কার্ডটি মূলত একটি 'ডেবিট কার্ড' হিসেবেও কাজ করবে।


বাস্তবায়নের তিন ধাপ ও পাইলট প্রকল্প

পুরো দেশজুড়ে এই কার্যক্রম একযোগে শুরু হচ্ছে না। সরকার এটিকে তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করবে:

১. প্রি-পাইলটিং বা প্রাক-পরীক্ষামূলক ধাপ: প্রাথমিকভাবে ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ২২,০৬৫ জন কৃষকের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হবে। ১৪ই এপ্রিল টাঙ্গাইল, বগুড়া, পঞ্চগড়, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, কক্সবাজার, রাজবাড়ি, মৌলভীবাজার এবং জামালপুরের নির্ধারিত ব্লকে এই কার্যক্রম শুরু হবে। কুমিল্লার একটি ব্লকে কার্ড দেওয়া হবে ১৭ই এপ্রিল থেকে।

২. পাইলটিং বা পরীক্ষামূলক ধাপ: প্রথম ধাপের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে।

৩. দেশব্যাপী বাস্তবায়ন: প্রথম দুই ধাপের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আগামী চার বছরের মধ্যে সারা দেশের সকল কৃষকের হাতে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।


অতীতের ব্যর্থতা ও নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি

২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও কৃষকদের জন্য ব্যাংক হিসাব ও কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতির কারণে সাধারণ কৃষকরা তার সুফল পাননি বলে মনে করেন গবেষকরা।

তবে সাধারণ কৃষকরা নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে বেশ আশাবাদী। অতীতের ব্যর্থতা প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, "এই কৃষক কার্ড শতভাগ রাজনীতিমুক্ত। অতীতে যা হয়েছে, তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।"


ডেস্ক রিপোর্ট, এক্সপ্রেস টিভি।