শাহজালাল বিমানবন্দরে ভয়াবহ কার্গো জট: সময়মতো পণ্য খালাস না হওয়ায় বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও প্রকট আকার ধারণ করেছে আমদানি পণ্যের জট। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানিকারকরা পণ্য খালাস না করায় কার্গো এলাকায় কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
কাস্টমস ও বিমান কর্তৃপক্ষের কড়া বার্তা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকা কাস্টমস হাউস এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, পণ্য বিমানবন্দরে পৌঁছানোর ৫ কার্যদিবসের মধ্যে 'বিল অব এন্ট্রি' দাখিল এবং পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে শুল্ক-কর পরিশোধ করে পণ্য ছাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অনেকেই এই নিয়ম মানছেন না।
এই অচলাবস্থা নিরসনে গত ১২ এপ্রিল ঢাকা কাস্টমস হাউসের কমিশনার মো. মসিউর রহমান ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এবং বিজিএমইএ-কে চিঠি দিয়ে দ্রুত পণ্য খালাসের আহ্বান জানান। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য না সরালে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
এর আগে, গত ৩০ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (কার্গো আমদানি) মো. জাহিদুজ্জামানও বিজিএমইএ সভাপতিকে চিঠি দিয়ে দ্রুত পণ্য ছাড়ানোর অনুরোধ করেন। চিঠিতে তিনি সতর্ক করে বলেন, গুদামে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় অনেক পণ্য বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে, যা যেকোনো মুহূর্তে আবহাওয়া জনিত কারণে নষ্ট হতে পারে। পাশাপাশি, এই পণ্যজট বিমানবন্দরের স্বাভাবিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কার্যক্রমকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিজিএমইএ-এর বক্তব্য ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ
পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণ হিসেবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান সাম্প্রতিক দীর্ঘ ঈদের ছুটিকেই দায়ী করেছেন। তিনি জানান, ঈদের ছুটির কারণে কাজে কিছুটা ধীরগতি ছিল। তবে বর্তমানে কারখানাগুলো পুরোদমে চালু থাকায় নিয়ম মেনে দ্রুত পণ্য ছাড়ানোর জন্য সকল সদস্যকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পোশাক রপ্তানিকারক বর্তমান পরিস্থিতির জন্য কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করেছেন। তার মতে, গত বছরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর গুদাম নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধীরগতির কারণেই আজকের এই পণ্যজট। ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো ভবনের জোন-বি এলাকায় সংস্কার কাজ চলমান থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
ফিরে আসছে ২০২৫ সালের অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি
কার্গো এলাকায় বর্তমান এই অব্যবস্থাপনা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা। ওই দিনের অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীদের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সে সময় গঠিত দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভয়াবহ ত্রুটি উঠে আসে।
তদন্ত কমিটির প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলো হলো:
- বিমানবন্দরে 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড' (বিএনবিসি) অনুসরণ করা হয়নি।
- অ্যাপ্রোন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টন পণ্য অরক্ষিত অবস্থায় স্তূপ করে রাখা হয়, যার কোনো সুষ্ঠু তদারকি নেই।
- যত্রতত্র পণ্য ফেলে রাখার কারণেই সেদিনের অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হয়।
- দাহ্য পদার্থের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার চরম ঘাটতি ছিল।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সাল থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে অন্তত সাতবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ থেকে বিমানবন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতিই বারবার স্পষ্ট হয়েছে। নতুন করে তৈরি হওয়া এই কার্গো জট ও অব্যবস্থাপনা তাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার আগেই দ্রুত নিরসন করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
