বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে অস্থিরতা: রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক

বাংলাদেশের ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে দলীয় বা সামাজিক বিভাজন ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) বারবার আলোচনায় এসেছে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে।

গত দুই বছরেরও কম সময়ে বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ চারবার পরিবর্তিত হয়েছে। প্রতিবারই এর পেছনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে, যা ক্রিকেট অঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৪ সালের আগস্টে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের পর দীর্ঘদিনের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন দায়িত্ব ছাড়েন। এরপর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন ফারুক আহমেদ। কিন্তু মাত্র নয় মাসের মধ্যেই বোর্ড পরিচালক ও অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টার অসন্তোষের মুখে তাকে অপসারণ করা হয়।

পরবর্তীতে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মাধ্যমে আমিনুল ইসলাম বুলবুল-কে বিসিবির সভাপতি করা হয়। তিনি কয়েক মাস অনির্বাচিতভাবে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে নির্বাচনের মাধ্যমে সভাপতির পদে আসীন হন। তবে সেই নির্বাচনেও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ওঠে।

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তদন্তে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ‘হস্তক্ষেপ’ থাকার অভিযোগ উঠে আসার পর সম্প্রতি সেই কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। নতুন করে তামিম ইকবাল-কে প্রধান করে একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিসিবির সাম্প্রতিক নির্বাচন এবং নতুন কমিটি গঠনের পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের ভূমিকা স্পষ্ট। নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য অবস্থান ও বক্তব্য বিষয়টিকে আরও আলোচিত করেছে।

নির্বাচনের সময় তামিম ইকবাল নিজেও অনিয়মের অভিযোগ তুলে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিলেন। সেই সময় তার পাশে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তিও উপস্থিত ছিলেন। বর্তমান অ্যাডহক কমিটির কয়েকজন সদস্যের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

এদিকে নতুন কমিটি ঘোষণার পরপরই আমিনুল ইসলাম বুলবুল এক বিবৃতিতে এটিকে ‘অবৈধ’ বলে দাবি করেন এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা International Cricket Council (আইসিসি)-র নজরে আনার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, যাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেউ কেউ তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। তারা দাবি করেছেন, স্বায়ত্তশাসিত একটি সংস্থার ওপর এমন তদন্ত চালানোর এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিসিবির বর্তমান গঠনতন্ত্র স্বাধীন ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও সেখানে বলা হয়েছে।


এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচন বাতিল করে নতুন অ্যাডহক কমিটি গঠন কতটা আইনসম্মত। পাশাপাশি, ক্রিকেট বোর্ডে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টিও আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

ক্রিকেট যেখানে একসময় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ছিল, সেখানে প্রশাসনিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক বিতর্ক ভবিষ্যতে এর ওপর কী প্রভাব ফেলবে—তা এখন সময়ই বলে দেবে।